পহেলা বৈশাখের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই ইলিশের

Print Friendly

পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ ভালো যায় না। আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নাই। ইলিশের প্রজনন মৌসুম এখন। আমার এ চিৎকার কারও-কারও কানে গেছে, বেশিরভাগেরই যায়নি। আমাদের সবার গায়ের রঙ সুন্দর, ক্রিম ঘষাঘষি করে তা বদলে ফেলার কোনও মানে নেই এ চিৎকারেও। আমাদের গণতান্ত্রিক, পরমতসহিষ্ণু হতে হবে এসব চিৎকারও মাঠেই মারা গেছে, যাচ্ছে। কিন্তু এই নতুন বছরে, আমি স্বপ্ন দেখি গড্ডলিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে আরও একটু যুক্তিবাদী হবো। স্বপ্ন দেখতে আমার ভালো লাগে, বিশেষ করে এই সব উৎসব মুহূর্তে।

spe4

ক’দিন আগে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন খালেদ মুহিউদ্দীন। খালেদ মুহিউদ্দীন সাংবাদিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। ভালো লেখেন। সঞ্চালনা করেন, ‘আজকের বাংলাদেশ’ ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। খালেদ মুহিউদ্দীন ফেসবুকে তার বেড়ানোর ছবি, কবরী বা মৌসুমীর সঙ্গে ছবি, বাড়ি ঘরের ছবি, স্ত্রী শাওনের বাহুলগ্ন হয়ে ছবি পোস্ট করলে যত ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ বা ‘কমেন্টস’এর ধুম পড়ে, এই স্ট্যাটাসে তার সিকি ভাগও পড়েনি। শেয়ার, লাইক, কমেন্ট দিয়ে হয়তো যায় আসে না কিছুই, তবে এটা খুব সত্য, কখনও কখনও সোসাইটির রুচি এবং আগ্রহ বুঝতে সাহায্যও করে ফেসবুক।

খালেদ মুহিউদ্দীনের সঙ্গে সম্পর্ক, বন্ধুত্ব শুধু কাজের কারণে, কাগজ ও মিডিয়াওয়াচের লেখালেখির কারণে গড়ে উঠেছিল তা নয়, বরং চিন্তার ঐক্য, ভাবনার ঐক্য, বিরক্তির ঐক্য, যুক্তির ঐক্য একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরে, ইলিশ যে বৈশাখের নয়, ঐতিহ্যেরও কোনও সম্পর্ক যে নেই এর সঙ্গে, ইলিশের এই প্রজনন ঋতুতে ইলিশ খাওয়া থেকে বিরত থাকা, বিরত রাখার জন্য খালেদই প্রথম সরব, উচ্চকণ্ঠ। চিৎকার তার, সঙ্গে যুক্ত করি চিৎকারটি আমারও।

মানুষের মধ্যে যুক্তিহীনতা, বিজ্ঞানহীনতা, প্রকৃতিবিরোধিতা, ধর্মান্ধতা ভয়ঙ্করভাবে কাজ করে। শিক্ষিত হলেই যে তার মধ্যে যুক্তিপ্রবণতা কাজ করবে তা নয়, বরং লেখাপড়া জানা লোকের মধ্যে কখনও কখনও যুক্তিহীনতার মাত্রা ভয়াবহ। ভয়াবহ এই কারণে যে, প্রচলিত শিক্ষা তাকে একটা ছকের মধ্যে থাকতে, ভাবতে, শিখতে সাহায্য করে। এই ছক থেকে সে সহজে বেরুতে পারে না। ফলে ছকের বাইরে বা বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ তাকে কোনও বিষয়ে বললে, সে তখন প্রস্তুত থাকে না তার কথা শুনতে। তখন স্বাভাবিকভাবেই বৃত্তের বাইরের মানুষটিকে শক্র বলে মনে হয়। অথচ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এলেই, বাইরে এসে দাঁড়ালেই বরং মোহভঙ্গ ঘটে, নির্মোহভাবে দেখা, ভাবা, বোঝা যায় ভেতরে কী ঘটছে। ভেতরে থাকলে অনেক সময় বোঝা যায় না, ভেতরের অবস্থা, বাইরে আসতে হয়।

আমরা মুখে যা বলি, তা সব সময় ধারণ করি না। বিশ্বাস তো আরও দূরের কথা। সবাই প্রগতিশীল। সবাই বিজ্ঞানমনস্ক। সবাই প্রকৃতিপ্রেমী। সবাই প্রকৃতি ভালোবাসি। অথচ প্রকৃতি কী, কীসে প্রকৃতির যায় আসে, বুঝি ক’জনে? কখনও কখনও চারপাশ দেখে মনে হয়, বড্ড হুজুগে আমরা, সবাই করছে তাই আমাকেও তা করতে হবে, সবাই যাচ্ছে তাই যেতে হবে আমাকেও, সবাই খাচ্ছে তাই আমাকেও খেতে হবে। কেন, কী কারণে, কী করবো বা করব না- তা একটিবারের জন্যও ভাবি না, ভাববার চেষ্টাও করি না আমরা।

বৈশাখ। বর্ষবরণ। মানুষ ও প্রকৃতির মিলন। প্রকৃতিকে বরণ করে নেওয়ার, প্রকৃতির সঙ্গে মিলবার, নিজেকে মেলাবার উৎসব। একজন বাঙালি হিসেবে পহেলা বৈশাখকেই সবচেয়ে বড় উৎসব বলে মনে করি আমি। এমন সার্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাঙালির জীবনে আর কোথায়? সকলে এসে গাইতে পারে বৈশাখের গান। যতই পুজো বলি, ঈদ বলি, বড়দিন বলি- শেষ পর্যন্ত সবই তো ধর্মের উৎসব, ধর্মের বিভেদ। সকল বিভেদ ভুলে প্রকৃতির এমন বন্দনার দিনটি কোথায় আর? অথচ প্রকৃতির এই উৎসবে প্রকৃতি বিরোধিতা, ইলিশ নিধন, ইলিশ হত্যার উৎসবে মেতে উঠি আমরা। মেনে নেওয়া যায় এই ভয়াবহতা?

ইলিশ বৈশাখের নয়। বৈশাখের সঙ্গে কোনও সম্পর্কও নেই ইলিশের। বৈশাখের সঙ্গে ইলিশকে যুক্ত করে যে ইলিশ নিধন তা নেহায়েত পুঁজি, বাণিজ্য ও মুনাফা সর্বস্বতা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন, বুঝবেন- এই ইলিশ বাণিজ্য ও বাণ্যিজিক মিডিয়ার। যদি প্রকৃতি সম্পর্কে, প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে ন্যূনতম কোনও জ্ঞান থাকে তাহলেই বোঝা যায়, ইলিশের সঙ্গে বৈশাখের কোনও সম্পর্ক নেই। প্রকৃতিই নির্ধারণ করে দিয়েছে কোন সময় কোন ফুল ফুটবে, কোন ফল ধরবে, কোন মাছ পাওয়া যাবে কখন। এইসময় ইলিশের ঘোর প্রজননের। এখন ইলিশমিথুন কাল। ইলিশ এখন সঙ্গম করবে, সুখ সাগরে ভাসবে যৌনসুখে, ঘুরে আসবে সাত আসমান। এই সময় ইলিশ নিধন নিতান্ত প্রকৃতি-বিরুদ্ধ কাজ। এখন ইলিশ খেলে ইলিশের বংশ বিস্তার হবে কিভাবে?

‘একটি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ষোল হাজার টাকায়’, ‘বৈশাখে ইলিশ চাই’, ‘বৈশাখে ইলিশ কিনেছেন তো?’- এমন শিরোনাম ও খবর ইলিশ কেনার ধুমকে নেহায়েত উস্কে দেয়। আইনগতভাবেও এই সময় ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে কী আইনও ভঙ্গ করছি না আমরা? তাজা ইলিশ, টাটকা ইলিশ বলে ‘সুপার শপে’ অতি উচ্চ মূল্যে, কুৎসিৎ চড়া দামে যে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে তা কেন খাচ্ছি? এই ইলিশ তো স্বাদহীন, গন্ধহীন, বাসি। প্রকৃতি, আবহাওয়া, বিজ্ঞান কোনও বিচারেই ইলিশ খাওয়ার সময় বৈশাখ নয়, বর্ষা।

আমার সুযোগ হয়েছিল খ্যাতিমান পুষ্টিবিদ সিদ্দিকা কবীরের সঙ্গে কাজ করার। তিনি ছিলেন খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে দেশে-বিদেশে সম্মানিত পরিচিত নাম। তার কাছে একদিন জানতেও চেয়েছিলাম, বৈশাখ বরণের খাদ্য তালিকা। বলেছিলেন, বৈশাখে ইলিশ খাওয়া নিতান্ত মূর্খতা, বিজ্ঞানহীনতা। আবহমানকাল থেকে গ্রাম বাংলায়, বৈশাখের দিনে পান্তাভাত, যে কোনও বড় মাছের ভাজা টুকরো, ছোট মাছের ঝোল, ডাল-সবজি চচ্চড়ি, নানা প্রকারের ভর্তা, টক দই- এ সবই বর্ষবরণে খাবার রীতি। সঙ্গে মিষ্টান্ন। চিড়া, মুড়ি, খই। অজিত কুমার গুহ, আহমদ ছফা, মুহম্মদ এনামুল হক, শামসুজ্জামান খান, মাহমুদুল হক অনেকেই লিখেছেন বৈশাখ নিয়ে, বাঙালির উৎসব নিয়ে, কোথাও ইলিশের হদিস পাওয়া যায়নি।

পুঁজি ও বাণিজ্য তার মুনাফার জন্য কত কিছুই না করে। কত কিছুই না ধ্বংস করে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম কিছুই বাদ যায় না তার হাত থেকে, গ্রাস থেকে। বর্ণবাদ-পুঁজিবাদ, কালো মানুষকে বলে ফর্সা হতে। স্লিম ফিগারের প্রচারণায় ছড়িয়ে পড়ে, ‘বুলেমিয়া’র মতো রোগ। আধুনিকতার নামে কাপড় খুলে উদোম করে মেয়েদের। লোম তুলতে ‘ব্লিচ ক্রিম’ বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। পুরুষদেরও ছাড়ে না পুঁজি, বাধ্য করে ‘মেন্স এ্যাকটিভ’ কিনতে। নির্দিষ্ট ব্রান্ডের আন্ডারওয়্যার না পরলে সেই পুরুষ ‘সুপুরুষ’ নয়। যৌনতা, যৌনাঙ্গও বাদ যায় না, হাত দেয় পুঁজি। রেহাই পায় না পুরুষ-নারী কেউই!

পুঁজির এই বাণিজ্যিক প্রচারণায় মিডিয়াও যুক্ত হয়, নিজেকে যুক্ত করে মুনাফার লাভে-লোভে। কারণ মিডিয়া, সেও তো পুঁজিরই!

লেখক : সদস্য, ফেমিনিস্ট ডট কম, যুক্তরাষ্ট্র
পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন
সম্পাদক, সাপ্তাহিক কাগজ ও মিডিয়াওয়াচ